|
ছোট্টমনিদের জগত হলো জুনিয়র সোনালি সকাল। ছোট্ট বন্ধুরা, এখানে তোমরা বিভিন্ন গল্প, কবিতা, ছড়া, ছবি আঁকা পাঠাতে পারবে। এখানে জানতে পারবে তোমাদের বন্ধুরা কি করছে। নতুন বন্ধুও খুঁজে নিতে পারবে এখান থেকে ... |
 |
|
|
|
 |
 |
 |
|
 |
|
|
|
|
| আমার দেখা জ্যোতি বসু |
 |
১৯৮৮ সালের বিয়ের ছবিতে জ্যোতি বসুর সঙ্গে লেখক (সর্ব বামে)
মোহাম্মদ হানিফ
সেটা ১৯৭০ সালের ২৩ অক্টোবর সন্ধ্যাবেলা। আমরা তখন চার বন্ধু সাদা রঙের টয়োটা করোলা কারে সেকেন্ড এশিয়ান হাইওয়ে কার র্যালিতে অংশগ্রহণ করার জন্য ইরানের পথে কলকাতায় ছিলাম। নারায়ণগঞ্জের জমিদার পরিবারের সন্তান ও পরবর্তী সময়ে পশ্চিম বাংলার বিখ্যাত শিল্পপতি সৌরেণ চক্রবর্তীর হিন্দুস্থান পার্কের বাসায় অবস্থান করছিলাম। সেখানে সৌরেণ চক্রবর্তীর বৈঠকখানায় কলকাতা হাইকোর্টের জাস্টিসসহ কয়েকজন আইনজীবী খোশগল্প করছিলেন। সেই মজলিসে আমি প্রথম জ্যোতি বসুকে দেখি। প্রথম দর্শনেই আমি বিমোহিত হয়ে যাই। দৃঢ় ব্যক্তিত্বের সুদর্শন পুরুষ। দেখলেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। পরিচয়ের পালা শেষে আমরা চলে আসি সেখান থেকে। জ্যোতি বসু তখন হিন্দুস্তান পার্কে থাকতেন। আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে কারণ ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারিতে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ থেকে আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে বর্ডার পারমিটের মাধ্যমে কলকাতায় যাই। এবং ঘটনাক্রমে কলকাতার বোল্টং স্ট্রিটে এক পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। সে পরিবারের কর্তা ছিলেন সিপিএমএর ডাকসাইটে নেতা মীর আবদুশ সাঈদ। তার স্ত্রী আমাকে আপন ভাইয়ের মর্যাদা দেন। আমরা তার বাসায় অবস্থান করি। সাঈদ ভাই সিপিএমএর অনেকগুলো সংগঠনের নেতা ছিলেন। তিনি দুবার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বিধায়ক ছিলেন। অত্যন্ত বন্ধুবৎসল পরোপকারী এবং একই সঙ্গে রসিক লোক ছিলেন তিনি। ফেব্রুয়ারির কোনো একদিন তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের সিপিএমএর কার্যালয়ে জ্যোতি বসুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে নিয়ে যান। সেটাও সন্ধ্যাবেলা ছিল। জ্যোতি বসু তখন তার অফিসের চেয়ারে বসা। সাঈদ ভাই আমাকে তার নিজের শ্যালক বলে জ্যোতি বসুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। জ্যোতি বসুর আদি বাসস্থান বাংলাদেশের বর্তমান নারায়ণগঞ্জের জেলার সোনার গাঁও-এর বারদীতে। তখন এটি ঢাকা জেলার মধ্যে ছিল। আবার সাঈদ ভাইয়ের নানা বাড়িও মানিকগঞ্জে। আমি ঢাকা থেকে গিয়েছি। জ্যোতি বসু হাসতে হাসতে বললেন, তাহলে আমরা তিনজনই বাঙাল। জ্যোতি বসু আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, সদ্য স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে কেমন লাগছে? আমি উত্তর দিলাম, এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমরা এখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বাঙালি, আমরা বাংলাদেশি। পৃথিবীর মানচিত্রে আমাদের একটা সুনির্দিষ্ট স্থান আছে। মুক্তিযুদ্ধে আপনাদের সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। লক্ষ করলাম আমরার কথায় জ্যোতি বসুর চোখ দুটোয় একটা ঝিলিক দিয়ে গেল। তিনি মুচকি হেসে বললেন, আশা করি তোমাদের স্বাতন্ত্র্যবোধকে সমুন্নত রাখবে। মিনিট দশেক সেখানে অবস্থান করে জ্যোতি বসুর সঙ্গে করমর্দন করে ফিরে এলাম। এরপর যতবার কলকাতায় গিয়েছি, সাঈদ ভাই টেলিফোনে জ্যোতি বসুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় আমার নাম উল্লেখ করলেই তিনি বলতেন, বাংলাদেশ থেকে ভাই এসেছে। নিশ্চয়ই বিরিয়ানি রান্না হবে। আমার ভাগটা যেন পাই। দেখতাম সাঈদ ভাই টিফিন ক্যারিয়ারে করে বিরিয়ানি ড্রাইভারের হাতে জ্যোতি বসুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। পরের দিন সকাল বেলা সাঈদকে ভাই টেলিফোনে জ্যোতি বসু বলতেন, হ্যা, তোমার বিরিয়ানি আমার নাতনি (চন্দনের মেয়ে)-কে নিয়ে খাচ্ছি। কাল ওগুলো রেফ্রিজেরেটারে রেখে দিয়েছিলাম। সাঈদ ভাই আমাকে জানালেন, জ্যোতি বসু বিরিয়ানি বাসী করে খেতে পছন্দ করেন। ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে সাঈদ ভাইয়ের বড় ছেলে মুন্নার বিয়েতে কলকাতায় গিয়েছি। সেন্ট পল ক্যাথেড্রল চার্চে বিয়ে। আড়ম্বরপূর্ণ বিয়ে। সাঈদ ভাই জানালেন, জ্যোতি বসু বিয়েতে আসছেন। জ্যোতি বসু সময়মতো বিয়েতে এলেন। সিকিউরিটিকে হাতে ঠেলে দিয়ে সাধারণ মানুষের মতো বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দে মেতে উঠলেন। স্টেজে উঠে বর কনেকে আশীর্বাদ করে মাঠে এসে চেয়ার নিয়ে বসে পড়লেন। ছেলে বুড়ো সবাই ঘিরে ধরলো। অনেকে অটোগ্রাফ চাইলেন, তিনি সমানে দিয়ে গেলেন। স্টেজে উঠে বর কনের সঙ্গে যখন ছবি তুললেন তখন আমিও সেখানে ছিলাম। বিয়ের অনুষ্ঠানে তার প্রচ্ছন্ন রসিক মনের পরিচয় পেলাম। রাজনীতিকের উর্ধে একজন সামাজিক মানুষ। শত সহস্র মেহনতী মানুষের প্রাণপুরুষ কালজয়ী শ্রী জ্যোতি বসু জগতের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে আজ এক অজানা ঠিকানার সন্ধানে প্রস্থান করেছেন। মেহনতী মানুষের এই শ্রদ্ধেয় নেতার শূণ্যতা কোনোদিন পূরণ হবার নয়। এই ক্ষণজন্মা পুরুষের স্মৃতি চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। বিশ্বের মেহনতী জনতার অবিসংবাদিত নেতা জ্যোতি বসুর প্রতি রইলে প্রাণ ঢালা শ্রদ্ধা। |
| |
|
|
|