|
ছোট্টমনিদের জগত হলো জুনিয়র সোনালি সকাল। ছোট্ট বন্ধুরা, এখানে তোমরা বিভিন্ন গল্প, কবিতা, ছড়া, ছবি আঁকা পাঠাতে পারবে। এখানে জানতে পারবে তোমাদের বন্ধুরা কি করছে। নতুন বন্ধুও খুঁজে নিতে পারবে এখান থেকে ... |
 |
|
|
|
 |
 |
 |
|
 |
|
|
|
|
| বন্ধু |
 |
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান
আকাশ আমার দুই চোখের বিষ। শুধু আমার বললে কম বলা হবে। আমাদের চোখের বিষ। অর্থাৎ আমাদের ছয় জনের বারোটি চোখের বিষ। কারণ অনেক, বলে শেষ করা যাবে না। আজকে সেই বিষের পরিমাণ আরো বেড়ে গেল। বিষের ওপরে বিষ। মহা বিষ! আজ ছিল এখলাস স্যারের ক্লাস। এখলাস স্যার আমাদের ইংরেজি রচনা পড়ান। তার চেহারা দেখলেই আমাদের কলজে শুকিয়ে যায়। আমরা ছয়জন অর্থাৎ আমি, বাবু, হিমেল, মুন্না, পল, আর মাকসুদ সব সময়ই এখলাস স্যারের ক্লাসে পেছনের বেঞ্চে বসি। মাথা একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলি। আর দোয়া দরুদের যতো স্টক আছে সব উজাড় করে দেই। শুধু শুধু এসব করি না। এখলাস স্যারের কাণ্ডকারখানা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। পৃথিবীতে যতো ভয়াবহ শাস্তি আছে তার প্রত্যেকটাই তিনি জানেন এবং আমাদের ওপর প্রয়োগ করেন। আজ আমাদের পড়া ছিল ইংরেজি রচনা ডিসিপ্লিন। আমাদের সিলেবাসে যতগুলো রচনা আছে তার মধ্যে কুৎসিৎতমটি হলো এই ডিসিপ্লিন। এটার আগাও বুঝি না, গোড়াও বুঝি না। অথচ পড়তে হচ্ছে আগা গোড়া সবটুকু। স্যারের পড়ানোর স্টাইলটা অতি বাজে! পুরো একটা রচনা দুই দিনের নোটিশে মুখস্থ করতে হবে। পুরোটা! বাদ দেয়া যাবে না কিছুই। আবার শিখতে হবে তার লেখা রচনা বই থেকে। একটা শব্দ বাদ পড়লে শাস্তি অবধারিত। একজনকে যদি বলেন, 'তুই ইনট্রোডাকশন বল' তো পাশের জনকে বলবেন, 'তুই কনক্লুয়েশন বল'। আমি তার প্রতি ক্লাসে শাস্তি পাওয়া ছাত্রদের একজন। আজো পেলাম। আজকের শাস্তিটা ছিল এ গ্রেডের শাস্তি। স্যারের চরম শাস্তিগুলোর একটি। পড়া না পারায় আমাদের তার টেবিলের সামনে দাঁড় করালেন তিনি। তারপর ঘড়ি ধরে এক মিনিট সময় দিলেন। এর মধ্যে নিজের চেষ্টায় কোনো রকম সাহায্য ছাড়া চোখে পানি আনতে হবে। যে চোখে পানি আনতে পারবে তাকে আর কোনো শাস্তি দেয়া হবে না। আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম পানি আনার জন্য। স্যার আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে। পনের সেকেণ্ডের আগে কেউ চোখের পাতাও ফেলতে পারবে না। ঠিকমত দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই সময়টা চলে গেল। আমরা কেউই চোখে পানি আনতে পারিনি। স্যার আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আজ তার মেজাজ খুবই খারাপ। কপালে যে কঠিন শাস্তি আছে তা আর কাউকে বলে দিতে হবে না। শাস্তি পাওয়া আটজনই দরদর করে ঘামছি। স্যার যেইমাত্র তার প্যান্ট থেকে বেল্টটা খুললেন অমনি খালেদ হাউমাউ করে কেঁদে দিল। এখন কাঁদলে কোনো লাভ নেই। চোখ দিয়ে মহাসাগর বের হলেও না। স্যার বেল্ট খুলে পেটাতে আরম্ভ করলেন।
অথচ ক্লাসের শুরুটা ছিল কতো না চমৎকার! আজ হতে পারতো আমাদের এক চরম আনন্দের দিন! আকাশ আজ পড়া পারেনি। সে পড়া শেখেইনি। যখন স্যারকে তা জানালো তখন আমাদের আনন্দ আর দেখে কে! আজ যাবি কোথায় বাপ! সে স্যারকে বললো, তার অসুখ। তাই পড়া শিখতে পারেনি। তারচেয়ে আটগুণ ভয়াবহ অসুখের কথা বলেও স্যারের হাত থেকে রেহাই পাই না। আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে পেছনের বেঞ্চ থেকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু স্যার তাকে বসতে বললেন! আমাদের বিস্ময় কাটতে না কাটতেই দেখি স্যার পেছনে এসে আমাদের বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়েছেন। আমরা সামান্য কারণে মার খেলাম অথচ আকাশ পড়া না পেরেও শাস্তি পেল না। তার ওপর রাগ করব না তো কার ওপর করব? আকাশ আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়। পৃথিবীর ওপর থেকে যেমন আকাশ সরানো যায় না, তেমনি রোল এক থেকেও আকাশকে সরানো যায় না। কম চেষ্টা হয়নি। আমাদের বাবু তো খুব ভালো ছাত্র। আকাশ এ স্কুলে আসার আগে বাবুই ছিল ফার্স্ট। কিন্তু আকাশ আসার পর থেকে বাবু সেই যে সেকেন্ড পজিশনে পড়ে আছে তো আছেই।
আকাশের আরেকটা ব্যাপার আমরা সহ্য করতে পারি না। একেবারে মেজাজ খিচড়ে যায়। ও শুধু ওর মায়ের প্রশংসা করে। তার মায়ের আচার কী মজা! শীতকালে তার মায়ের বোনা জাম্পার পরে আসে, স্কুল থেকে ফিরে গিয়ে দেখে মা খাবার নিয়ে বসে আছে আরো কত কিছু! আর ক্লাসের এক দল ছেলে তারা আকাশকে একেবারে আকাশে তুলে রাখে। সে যা বলে তাই বিশ্বাস করে। সে যা করে তাই মুগ্ধ হয়ে দেখে। আমাদের পিত্তি জ্বলে যায়! আর ওর মা'টাই বা কেমন? এত লাই দেয় নাকি কেউ? আমার মা-তো দিনে আঠারোবার কান মচলে দিয়ে বলে 'তুই একটা গরু।' যেন পৃথিবীতে আর কোনো প্রাণী নেই। অন্য কিছুওতো বলতে পারে!
আকাশকে একটা কঠিন শাস্তি দেয়ার কথা ভাবছিলাম অনেকদিন ধরে। হঠাৎ পেয়ে গেলাম। সুযোগটা ওই করে দিল। ফাইনাল পরীক্ষা সে অসুখের জন্য ভালো দিতে পারেনি। সেই ফাঁকে ফার্স্ট হলো বাবু। আমাদের আনন্দ তখন দেখে কে! আকাশ সেকেন্ড, কথাটা ভাবতেই আনন্দে মন ভরে গেল। রেজাল্টের দিন আকাশ স্কুলে না আসায় ঠিক করলাম ওর বাসায় গিয়ে ওর মায়ের সামনেই রেজাল্ট শুনিয়ে আসবো। মহা উল্লাসে হাজির হলাম আমরা আকাশের বাসার সামনে। ওর বাসায় এর আগে কখনো আসিনি। তবে বাসা চিনতাম। শত্রুর বাসা চেনা থাকতে হয়। কলিংবেল টেপার পর যিনি দরজা খুললেন তিনি আকাশের বাবা। কী গম্ভীর রে বাবা! আমাদের সব কথা লং মার্চ করে মুখ থেকে পেটের ভেতরে রওনা হল। তিনি জানতে চাইলেন আমরা কেন এসেছি। আমরা একজন আরেক জনের দিকে তাকালাম। শেষে আমি বহুকষ্টে উচ্চারণ করলাম, আকাশ...। ও তোমরা আকাশের বন্ধু। আকাশকে দেখতে এসেছ বুঝি। কিন্তু ও তো এখন ঘুমিয়ে আছে, বললেন তিনি। কথা শুনে জেদ চেপে গেল। বললাম, ওর মাকে আসতে বলুন। ওনাকে একটা খবর দেব। ভদ্রলোক আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমরা ভেতরে এসো। আমরা ড্রইং রুমে বসলাম। এরা তো দেখি হেভি বড়লোক! আকাশকে দেখে তো কিছুই বোঝার উপায় নেই। ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমরা বোধ হয় জানো না যে আকাশের মা নেই। আমরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। তিনি বলে চললেন, আকাশের যখন দুই বছর বয়স তখন ওর মা মারা যায়। ছোটবেলা থেকেই মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছে সে। একটু একটু করে যখন বড় হতে লাগলো তখন মায়ের অভাবটা বুঝতে শিখলো। মা থাকলে তাকে কেমন আদর করত সেসব চিন্তা সব সময়ই তার মাথায় ঘুরতো। সেসব চিন্তাগুলোকে এক করে সে একটা কাল্পনিক মা বানিয়ে নিয়েছে। যে তাকে সবসময় আদর করে। তোমরা কি আমার কথা বুঝতে পারছ? ভদ্রলোকের চোখে পানি চলে এসেছে। আমরা মাথা নিচু করে বসে আছি। তিনি বলে চললেন, মা নেই বলে অনেকেই তাকে করুণা করে, ও সেটা একেবারেই পছন্দ ... তার কথা শেষ করার আগেই আকাশ ড্রইং রুমে ঢুকলো। ওর ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে। ওকে দেখে আমরা চমকে ওঠলাম। এ কোন আকাশ? একি অবস্থা হয়েছে তার। শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে আর একেবারে কালো হয়ে গেছে। কী এমন অসুখ ওর? দুর্বল পায়ে সে হেটে এসে বলল, আরে তোরা। রেজাল্ট জানাতে এসেছিস বুঝি। বাবু নিশ্চয়ই এবার ফার্স্ট হয়েছে। তাই না? আমরা মাথা নিচু করে ফেললাম। জীবনে কোনদিনও নিজেকে এতো ছোট মনে হয়নি। আমার চোখে পানি এসে গেল। আমি দৌড়ে গিয়ে আকাশের কাছে গিয়ে বললাম, আকাশ তুই কেমন আছিস? আকাশ একটু হেসে আমার কাধে একটা হাত রাখল। কেমন যেন মনে হলো আমার। পৃথিবীতে এতো সুখের এতো আনন্দের স্পর্শ আমি আর কোথাও পাইনি।
|
| |
|
|
|